Wednesday, October 3, 2012


                                                                    প্রথম পরিচ্ছেদ : সাগর সঙ্গমে



প্রায় দুই শত পঞ্চাশ বসর পূর্ব্বে এক দিন মাঘ মাসের রাত্রিশেষে একখানি যাত্রীর নৌকা গঙ্গাসাগর হইতে প্রত্যাগমন করিতেছিলপর্ত্তুগিস্‌ ও অন্যান্য নাবিকদস্যুদিগের ভয়ে যাত্রীর নৌকা দলবদ্ধ হইয়া যাতায়াত করাই তকালের প্রথা ছিল; কিন্তু এই নৌকাবিহারীরা সঙ্গিহীনতাহার কারণ এই যে, রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়া ছিল; নাবিকেরা দিঙ্‌নিরূপণ করিতে না পারিয়া বহর হইতে দূরে পড়িয়াছিলএক্ষণে কোন্‌ দিকে কোথায় যাইতেছে, তাহার কিছুই নিশ্চয়তা ছিল নানৌকারোহিগণ অনেকেই নিদ্রা যাইতেছিলেনএকজন প্রাচীন এবং একজন যুবা পুরুষ, এই দুই জন মাত্র জাগ্রত অবস্থায় ছিলেনপ্রাচীন যুবকের সহিত কথোপকথন করিতেছিলেনবারেক কথাবার্ত্তা স্থগিত করিয়া বৃদ্ধ নাবিকদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাঝি, আজ আর কত দূর যেতে পারবি?” মাঝি কিছু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “বলিতে পারিলাম না
বৃদ্ধ ক্রুদ্ধ হইয়া মাঝিকে তিরস্কার করিতে লাগিলেনযুবক কহিলেন, “মহাশয়, যাহা জগদীশ্বরের হাত, তাহা পণ্ডিতে বলিতে পারে না ও মূর্খ কি প্রকারে বলিবে? আপনি ব্যস্ত হইবেন না
বৃদ্ধ উগ্রভাবে কহিলেন, “ব্যস্ত হব না? বল কি, বেটারা বিশ পঁচিশ বিঘার ধান কাটিয়া লইয়া গেল, ছেলেপিলে সম্বসর খাবে কি?”
এ সংবাদ তিনি সাগরে উপনীত হইলে পরে পশ্চাদাগত অন্য যাত্রীর মুখে পাইয়াছিলেনযুবা কহিলেন, “আমি ত পূর্ব্বেই বলিয়াছিলাম, মহাশয়ের বাটীতে অভিভাবক আর কেহ নাই মহাশয়ের আসা ভাল হয় নাই
প্রাচীন পূর্ব্বব উগ্রভাবে কহিলেন, “আসব না? তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছেএখন পরকালের কর্ম্ম করিব না ত কবে করিব?”
যুবা কহিলেন, “যদি শাস্ত্র বুঝিয়া থাকি, তবে তীর্থদর্শনে যেরূপ পরকালের কর্ম্ম হয়, বাটী বসিয়াও সেরূপ হইতে পারে
বৃদ্ধ কহিলেন, “তবে তুমি এলে কেন?”
যুবা উত্তর করিলেন, “আমি ত আগেই বলিয়াছি যে, সমুদ্র দেখিব বড় সাধ ছিল, সেই জন্যই আসিয়াছিপরে অপেক্ষাকৃত মৃদু স্বরে কহিতে লাগিলেন, “আহা! কি দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না
দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী তমালতালীবনরাজিনীলা
আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশের্দ্ধারানিবদ্ধের কলঙ্করেখা
বৃদ্ধের শ্রুতি কবিতার প্রতি ছিল নানাবিকেরা পরস্পর যে কথোপকথন করিতেছিল, তাহাই একতামনা হইয়া শুনিতেছিলেন
একজন নাবিক অপরকে কহিতেছিল, “ও ভাই এ ত বড় কাজটা খারাবি হলো এখন কি বার-দরিয়ায় পড়লেম কি কোন দেশে এলেম, তা যে বুঝিতে পারি না
বক্তার স্বর অত্যন্ত ভয়কাতরবৃদ্ধ বুঝিলেন যে, কোন বিপদ্‌ আশঙ্কার কারণ উপস্থিত হইয়াছেসশঙ্কচিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাঝি কি হয়েছে?” মাঝি উত্তর করিল নাকিন্তু যুবক উত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়া বাহিরে আসিলেনবাহিরে আসিয়া দেখিলেন যে, প্রায় প্রভাত হইয়াছেচতুর্দ্দিকে অতি গাঢ় কুজ্ঝটিকায় ব্যাপ্ত হইয়াছে; আকাশ, নক্ষত্র, চন্দ্র, উপকূল, কোন কিছুই দেখা যাইতেছে নাবুঝিলেন, নাবিকদের দিগ্‌ভ্রম হইয়াছেএক্ষণে কোন্‌ দিকে যাইতেছে, তাহার নিশ্চয়তা পাইতেছে না পাছে বাহির সমুদ্রে পড়িয়া অকূলে মারা যায়, এই আশঙ্কায় ভীত হইয়াছে
হিমনিবারণ জন্য সম্মুখে আবরণ দেওয়া ছিল, এজন্য নৌকার ভিতর হইতে আরোহীরা এ সকল বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাইকিন্তু নব্য যাত্রী অবস্থা বুঝিতে পারিয়া বৃদ্ধকে সবিশেষ কহিলেন; তখন নৌকামধ্যে মহাকোলাহল পড়িয়া গেলযে কয়েকটি স্ত্রীলোক নৌকামধ্যে ছিল তন্মধ্যে কেহ কেহ কথার শব্দে জাগিয়াছিল, শুনিবামাত্র তাহারা আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিলপ্রাচীন কহিল, “কেনারায় পড়! কেনারায় পড়! কেনারায় পড়!
নব্য ঈষ হাসিয়া কহিলেন, “কেনারা কোথা, তাহা জানিতে পারিলে এত বিপদ্‌ হইবে কেন?”
ইহা শুনিয়া নৌকারোহীদিগের কোলাহল আরও বৃদ্ধি পাইলনব্য যাত্রী কোন মতে তাহাদিগকে স্থির করিয়া নাবিকদিগকে কহিলেন, “আশঙ্কার বিষয় কিছু নাই, প্রভাত হইয়াছে চারি পাঁচ দণ্ডের মধ্যে নৌকা কদাচ মারা যাইবে নাতোমরা এক্ষণে বাহন বন্ধ কর, স্রোতে নৌকা যথায় যায় যাক্‌; পশ্চা রৌদ্র হইলে পরামর্শ করা যাইবে
নাবিকেরা এই পরামর্শে সম্মত হইয়া তদনুরূপ আচরণ করিতে লাগিল
অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত নাবিকেরা নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলযাত্রীরা ভয়ে কণ্ঠাগত প্রাণবেশী বাতাস নাইসুতরাং তাঁহারা তরঙ্গান্দোলনকম্প বড় জানিতে পারিলেন নাতথাপি সকলেই মৃত্যু নিকট নিশ্চিত করিলেনপুরুষেরা নিঃশব্দে দুর্গানাম জপ করিতে লাগিলেন, স্ত্রীলোকেরা সুর তুলিয়া বিবিধ শব্দবিন্যাসে কাঁদিতে লাগিলএকটি স্ত্রীলোক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জ্জন করিয়া আসিয়াছিল, ছেলে জলে দিয়া আর তুলিতে পারে নাই, – সেই কেবল কাঁদিল না
প্রতীক্ষা করিতে করিতে অনুভবে বেলা প্রায় এক প্রহর হইলএমত সময়ে অকস্মা নাবিকেরা দরিয়ার পাঁচ পীরের নাম কীর্ত্তিত করিয়া মহাকোলাহল করিয়া উঠিলযাত্রীরা সকলেই জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিল, “কি! কি! মাঝি, কি হইয়াছে?” মাঝিরাও একবাক্যে কোলাহল করিয়া কহিতে লাগিল, “রোদ উঠেছে! ঐ দেখ ডাঙা!যাত্রীরা সকলেই ঔসুক্যসহকারে নৌকার বাহিরে আসিয়া কোথায় আসিয়াছেন, কি বৃত্তান্ত, দেখিতে লাগিলেনদেখিলেন, সূর্য্যপ্রকাশ হইয়াছেকুজ্ঝটিকার অন্ধকাররাশি হইতে দিঙ্‌মণ্ডল একেবারে বিমুক্ত হইয়াছেবেলা প্রায় প্রহরাতীত হইয়াছেযে স্থানে নৌকা আসিয়াছে, সে প্রকৃত মহাসমুদ্র নহে, নদীর মোহানা মাত্র, কিন্তু তথায় নদীর যেরূপ বিস্তার, সেরূপ বিস্তার আর কোথাও নাইনদীর এক কূল নৌকার অতি নিকটবর্ত্তী বটে, – এমন কি, পঞ্চাশ হস্তের মধ্যগত, কিন্তু অপর কূলের চিহ্ন দেখা যায় নাআর যে দিকেই দেখা যায়, অনন্ত জলরাশি চঞ্চল রবিরশ্মিমালাপ্রদীপ্ত হইয়া গগনপ্রান্তে গগনসহিত মিশিয়াছেনিকটস্থ জল, সচরাচর সকর্দ্দম নদীজলবর্ণ; কিন্তু দূরস্থ বারিরাশি নীলপ্রভআরোহীরা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করিলেন যে, তাঁহারা মহাসমুদ্রে আসিয়া পড়িয়াছেন; তবে সৌভাগ্য এই যে, উপকূল নিকটে, আশঙ্কার বিষয় নাইসূর্য্যপ্রতি দৃষ্টি করিয়া দিক্‌ নিরূপিত করিলেনসম্মুখে যে উপকূল দেখিতেছিলেন, সে সহজেই সমুদ্রের পশ্চিম তট বলিয়া সিদ্ধান্ত হইল  তটমধ্যে নৌকার অনতিদূরে এক নদীর মুখ মন্দগামী কলধৌতপ্রবাহব আসিয়া পড়িতেছিলসঙ্গমস্থলে দক্ষিণ পার্শ্বে বৃহ সৈকতভূমিখণ্ডে নানাবিধ পক্ষিগণ অগণিত সংখ্যায় ক্রীড়া করিতেছিলএই নদী এক্ষণে রসুলপুরের নদীনাম ধারণ করিয়াছে

0 মন্তব্য(গুলি):

Post a Comment

Thnaks