Wednesday, October 3, 2012


পঞ্চম পরিচ্ছেদ : সমুদ্রতটে
“ – যোগপ্রভাবো ন চ লক্ষ্যতে তে
বিভর্ষি চাকারমনির্ব্বৃতানাং মৃণালিনী হৈমমিবো পরাগম্
রঘুবংশ
প্রাতে উঠিয়া নবকুমার সহজেই বাটী গমনের উপায় করিতে ব্যস্ত হইলেন; বিশেষ, এ কাপালিকের সান্নিধ্য কোনক্রমেই শ্রেয়স্কর বলিয়া বোধ হইল নাকিন্তু আপাততঃ এ পথহীন বনমধ্য হইতে কি প্রকারে নিষ্ক্রান্ত হইবেন? কি প্রকারেই বা পথ চিনিয়া বাটী যাইবেন? কাপালিক অবশ্য পথ জানে, জিজ্ঞাসিলে কি বলিয়া দিবে না? বিশেষ, যতদূর দেখা গিয়াছে, তত দূর কাপালিক তাঁহার প্রতি কোন শঙ্কাসূচক আচরণ করে নাই কেনই বা তবে তিনি ভীত হন? এ দিকে কাপালিক তাঁহাকে পুনঃসাক্ষা পর্য্যন্ত কুটীর ত্যাগ করিতে নিষেধ করিয়াছে, তাহার অবাধ্য হইলে বরং তাহার রোষোপত্তির সম্ভাবনানবকুমার শ্রুত ছিলেন যে কাপালিকেরা মন্ত্রবলে অসাধ্যসাধনে সক্ষম এ কারণে তাহার অবাধ্য হওয়া অনুচিতইত্যাদি বিবেচনা করিয়া নবকুমার আপাততঃ কুটীর মধ্যে অবস্থান করাই স্থির করিলেন
কিন্তু ক্রমে বেলা অপরাহ্ণ হইয়া আসিল, তথাপি কাপালিক প্রত্যাগমন করিল নাপূর্ব্বদিনের উপবাস, অদ্য এ পর্য্যন্ত অনশন, ইহাতে ক্ষুধা প্রবল হইয়া উঠিলকুটীরমধ্যে যে অল্প ফলমূল, তাহা পূর্ব্বরাত্রেই ভুক্ত হইয়াছিল এক্ষণে কুটীর ত্যাগ করিয়া ফলমূলান্বেষণ না করিলে ক্ষুধায় প্রাণ যায়অল্প বেলা থাকিতে ক্ষুধার পীড়নে নবকুমার ফলান্বেষণে বাহির হইলেন
নবকুমার ফলান্বেষণে নিকটস্থ বালুকাস্তূপসকলের চারিদিকে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেনযে দুই একটা গাছ বালুকায় জন্মিয়া থাকে, তাহার ফলাস্বাদন করিয়া দেখিলেন যে, এক বৃক্ষের ফল বাদামের ন্যায় অতি সুস্বাদুতদ্বারা ক্ষুধানিবৃত্তি করিলেন
কথিত বালুকাস্তূপশ্রেণী প্রস্থে অতি অল্প, অতএব নবকুমার অল্পকাল ভ্রমণ করিয়া তাহা পার হইলেনপরে বালুকাবিহীন নিবিড় বনমধ্যে পড়িলেনযাঁহারা ক্ষণকালজন্য অপূর্ব্বপরিচিত বনমধ্যে ভ্রমণ করিয়াছেন, তাঁহারা জানেন যে, পথহীন বনমধ্যে ক্ষণমধ্যেই পথভ্রান্তি জন্মেনবকুমারের তাহাই ঘটিলকিছু দূর আসিয়া আশ্রম কোন্‌ পথে রাখিয়া আসিয়াছেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন নাগম্ভীর জলকল্লোল তাঁহার কর্ণপথে প্রবেশ করিল; তিনি বুঝিলেন যে, এ সাগরগর্জ্জনক্ষণকাল পরে অকস্মা বনমধ্য হইতে বহির্গত হইয়া দেখিলেন যে, সম্মুখেই সমুদ্রঅনন্তবিস্তার নীলাম্বুমণ্ডল সম্মুখে দেখিয়া উকটানন্দে হৃদয় পরিপ্লুত হইলসিকতাময় তটে গিয়া উপবেশন করিলেনফেনিল, নীল, অনন্ত সমুদ্রউভয় পার্শ্বে যত দূর চক্ষু যায়, তত দূর পর্য্যম্ত তরঙ্গভঙ্গপ্রক্ষিপ্ত ফেনার রেখা; স্তূপীকৃত বিমল কুসুমদাম গ্রথিত মালার ন্যায় সে ধবল ফেনরেখা হেমকান্ত সৈকতে ন্যস্ত হইয়াছে; কাননকুন্তলা ধরণীর উপযুক্ত অলকাভরণনীলজলমণ্ডলমধ্যে সহস্র স্থানেও সফেন তরঙ্গ ভঙ্গ হইতেছিলযদি কখন এমত প্রচণ্ড বায়ুবহন সম্ভব হয় যে, তাহার বেগে নক্ষত্রমালা সহস্রে সহস্রে স্থানচ্যুত হইয়া নীলাম্বরে আন্দোলিত হইতে থাকে, তবেই সে সাগরতরঙ্গক্ষেপের স্বরূপ দৃষ্ট হইতে পারেএ সময়ে অস্তগামী দিনমণির মৃদুল কিরণে  নীলজলের একাংশ দ্রবীভূত সুবর্ণের ন্যায় জ্বলিতেছিলঅতিদূরে কোন ইউরোপীয় বণিকজাতির সমুদ্রপোত শ্বেতপক্ষ বিস্তার করিয়া বৃহ পক্ষীর ন্যায় জলধিহৃদয়ে উড়িতেছিল
কতক্ষণ যে নবকুমার তীরে বসিয়া অনন্যমনে জলধিশোভা দৃষ্টি করিতে লাগিলেন, তদ্বিষয়ে তকালে তিনি পরিমাণ-বোধ-রহিতপরে একেবারে প্রদোষতিমির আসিয়া কাল জলের উপর বসিলতখন নবকুমারের চেতনা হইল যে, আশ্রম সন্ধান করিয়া লইতে হইবেকদীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া গাত্রোত্থান করিলেনদীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন কেন, তাহা বলিতে পারি না তখন তাঁহার মনে কোন্‌ ভূতপূর্ব্ব সুখের উদয় হইতেছিল, তাহা কে বলিবে? গাত্রোত্থান করিয়া সমুদ্রের দিকে ফিরিলেনফিরিবামাত্র দেখিলেন, অপূর্ব্ব মূর্ত্তি! সেই গম্ভীরনাদী বারিধিতীরে, সৈকতভূমে অস্পষ্ট সন্ধ্যালোকে দাঁড়াইয়া অপূর্ব্ব রমণীমূর্ত্তি! কেশভার অবেণীসম্বন্ধ, সংসর্পিত, রাশীকৃত, আগুল্‌ফলম্বিত কেশভার; তদগ্রে দেহরত্ন; যেন চিত্রপটের উপর চিত্র দেখা যাইতেছেঅলকাবলীর প্রাচুর্য্যে মুখমণ্ডল সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ হইতেছিল না তথাপি মেঘবিচ্ছেদনিঃসৃত চন্দ্ররশ্মির ন্যায় প্রতীত হইতেছিলবিশাল লোচনে কটাক্ষ অতি স্নিগ্ধ, অতি গম্ভীর, অথচ জ্যোতির্ম্ময়; সে কটাক্ষ, এই সাগরহৃদয়ে ক্রীড়াশীল চন্দ্রকিরণলেখার ন্যায় স্নিগ্ধোজ্জ্বল দীপ্তি পাইতেছিলকেশরাশিতে স্কন্ধদেশ ও বাহুযুগল আচ্ছন্ন করিয়াছিলস্কন্ধদেশ একেবারে অদৃশ্য; বাহুযুগলের বিমলশ্রী কিছু কিছু দেখা যাইতেছিলরমণীদেহ একেবারে নিরাভরণমূর্ত্তিমধ্যে যে একটা মোহিনী শক্তি ছিল, তাহা বর্ণিতে পারা যায় নাঅর্দ্ধচন্দ্রনিঃসৃত কৌমুদিবর্ণ; ঘনকৃষ্ণ চিকুরজাল; পরস্পরের সান্নিধ্যে কি বর্ণ, কি চিকুর, উভয়েরই যে শ্রী বিকসিত হইতেছিল, তাহা সেই গম্ভীরনাদী সাগরকূলে, সন্ধ্যালোকে না দেখিলে তাহার মোহিনী শক্তি অনুভূত হয় না
নবকুমার অকস্মা এইরূপ দুর্গমমধ্যে দেবী মূর্ত্তি দেখিয়া নিস্পন্দশরীর হইয়া দাঁড়াইলেনতাঁহার বাক্‌শক্তি রহিত হইল; – স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিলেনরমণীও স্পন্দহীন, অনিমেষলোচনে বিশাল চক্ষুর স্থিরদৃষ্টি নবকুমারের মুখে ন্যস্ত করিয়া রাখিলেনউভয়মধ্যে প্রভেদ এই যে, নবকুমারের দৃষ্টি চমকিত লোকের দৃষ্টির ন্যায়, রমণীর দৃষ্টিতে সে লক্ষণ কিছুমাত্র নাই, কিন্তু তাহাতে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ হইতেছিল
অনন্তর সমুদ্রের জনহীন তীরে, এইরূপে বহুক্ষণ দুইজনে চাহিয়া রহিলেনঅনেকক্ষণ পরে তরুণীর কণ্ঠস্বর শুনা গেলতিনি অতি মৃদুস্বরে কহিলেন, “পথিক, তুমি পথহারাইয়াছ?”
এই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নবকুমারের হৃদয়বীণা বাজিয়া উঠিলবিচিত্র হৃদয়যন্ত্রের তন্ত্রীচয় সময়ে সময়ে এরূপ লয়হীন হইয়া থাকে যে, যত যত্ন করা যায়, কিছুতেই পরস্পর মিলিত হয় নাকিন্তু একটি শব্দে, একটি রমণীকণ্ঠসম্ভূত স্বরে সংশোধিত হইয়া যায়সকলই লয়বিশিষ্ট হয়সংসারযাত্রা সেই অবধি সুখময় সঙ্গীতপ্রবাহ বলিয়া বোধ হয়নবকুমারের কর্ণে সেইরবপ এ ধ্বনি বাজিল
পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ?” এ ধ্বনি নবকুমারের কর্ণে প্রবেশ করিলকি অর্থ, কি উত্তর করিতে হইবে, কিছুই মনে হইল নাধ্বনি যেন হর্ষবিকম্পিত হইয়া বেড়াইতে লাগিল; যেন পবনে সেই ধ্বনি বহিল; বৃক্ষপত্রে মর্ম্মরিত হইতে লাগিল; রমণী সুন্দরী; ধ্বনিও সুন্দর; হৃদয়তন্ত্রীমধ্যে সৌন্দর্য্যের লয় মিলিতে লাগিল
রমণী কোন উত্তর না পাইয়া কহিলেন, “আইসএই বলিয়া তরুণী চলিল; পদক্ষেপ লক্ষ্য হয় নাবসন্তকালে মন্দানিল-সঞ্চালিত শুভ্র মেঘের ন্যায় ধীরে ধীরে, অলক্ষ্য পাদবিক্ষেপে চলিল; নবকুমার কলের পুত্তলীর ন্যায় চলিলেনএক স্থানে একটা ক্ষুদ্র বন পরিবেষ্টন করিতে হইবে, বনের অন্তরালে গেলে, আর সুন্দরীকে দেখিতে পাইলেন নাবনবেষ্টনের পর দেখেন যে, সম্মুখে কুটীর

0 মন্তব্য(গুলি):

Post a Comment

Thnaks