Wednesday, October 3, 2012


RE: উপন্যাসঃ চোখের বালি।। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

আশা কেমন ভয় পাইয়া গেলএ কী হইলমা চলিয়া যান, মাসিমা চলিয়া যানতাহাদের সুখ যেন সকলকেই তাড়াইতেছে, এবার যেন তাহাকেই তাড়াইবার পালাপরিত্যক্ত শূন্য গৃহস্থালির মাঝখানে দাম্পত্যের নূতন প্রেমলীলা তাহার কাছে কেমন অসংগত ঠেকিতে লাগিল

সংসারের কঠিন কর্তব্য হইতে প্রেমকে ফুলের মতো ছিঁড়িয়া স্বতন্ত্র করিয়া লইলে, তাহা কেবল আপনার রসে আপনাকে সজীব রাখিতে পারে না, তাহা ক্রমেই বিমর্ষ ও বিকৃত হইয়া আসেআশাও মনে মনে দেখিতে লাগিল, তাহাদের অবিশ্রাম মিলনের মধ্যে একটা শ্রান্তি ও দুর্বলতা আছেসে মিলন যেন থাকিয়া থাকিয়া কেবলই মুষড়িয়া পড়েসংসারের দৃঢ় ও প্রশস্ত আশ্রয়ের অভাবে তাহাকে টানিয়া খাড়া রাখাই কঠিন হয়কাজের মধ্যেই প্রেমের মূল না থাকিলে, ভোগের বিকাশ পরিপূর্ণ এবং স্থায়ী হয় না

মহেন্দ্রও আপনার বিমুখ সংসারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া আপন প্রেমোসবের সকল বাতিগুলাই একসঙ্গে জ্বালাইয়া খুব সমারোহের সহিত শূন্যগৃহের অকল্যাণের মধ্যে মিলনের আনন্দ সমাধা করিতে চেষ্টা করিলআশার মনে সে একটুখানি খোঁচা দিয়াই কহিল, “চুনি, তোমার আজকাল কী হইয়াছে বলো দেখিমাসি গেছেন, তা লইয়া অমন মন ভার করিয়া আছ কেনআমাদের দুজনার ভালোবাসাতেই কি সকল ভালোবাসার অবসান নয়

আশা দুঃখিত হইয়া ভাবিত, ‘তবে তো আমার ভালোবাসায় একটা কী অসম্পূর্ণতা আছেআমি তো মাসির কথা প্রায়ই ভাবি; শাশুড়ি চলিয়া গেছেন বলিয়া তো আমার ভয় হয়তখন সে প্রাণপণে এই-সকল প্রেমের অপরাধ ক্ষালন করিতে চেষ্টা করে

এখন গৃহকর্ম ভালো করিয়া চলে নাচাকরবাকরেরা ফাঁকি দিতে আরম্ভ করিয়াছেএকদিন ঝি অসুখ করিয়াছে বলিয়া আসিল না, বামুনঠাকুর মদ খাইয়া নিরুদ্দেশ হইয়া রহিলমহেন্দ্র আশাকে কহিল, “বেশ মজা হইয়াছে, আজ আমরা নিজেরা রন্ধনের কাজ সারিয়া লইব

মহেন্দ্র গাড়ি করিয়া নিউ মার্কেটে বাজার করিতে গেলকোন্‌ জিনিসটা কী পরিমাণে দরকার, তাহা তাহার কিছুমাত্র জানা ছিল নাকতকগুলা বোঝা লইয়া আনন্দে ঘরে ফিরিয়া আসিলসেগুলা লইয়া যে কী করিতে হইবে, আশাও তাহা ভালোরূপ জানে নাপরীক্ষায় বেলা দুটা-তিনটা হইয়া গেল এবং নানাবিধ অভূতপূর্ব অখাদ্য উদ্‌ভাবন করিয়া মহেন্দ্র অত্যন্ত আমোদ বোধ করিলআশা মহেন্দ্রের আমোদে যোগ দিতে পারিল না, আপন অজ্ঞতা ও অক্ষমতায় মনে মনে অত্যন্ত লজ্জা ও ক্ষোভ পাইল

ঘরে ঘরে জিনিসপত্রের এমনি বিশৃঙ্খলা ঘটিয়াছে যে, আবশ্যকের সময়ে কোনো জিনিস খুঁজিয়া পাওয়াই কঠিনমহেন্দ্রের চিকিসার অস্ত্র একদিন তরকারি কুটিবার কার্যে নিযুক্ত হইয়া আবর্জনার মধ্যে অজ্ঞাতবাস গ্রহণ করিল এবং তাহার নোটের খাতা হাতপাখার অ্যাকটিনি করিয়া রান্নাঘরের ভস্মশয্যায় বিশ্রাম করিতে লাগিল

এই-সকল অভাবনীয় ব্যবস্থাবিপর্যয়ে মহেন্দ্রের কৌতুকের সীমা রহিল না, কিন্তু আশা ব্যথিত হইতে থাকিলউচ্ছৃঙ্খল যথেচ্ছাচারের স্রোতে সমস্ত ঘরকন্না ভাসাইয়া হাস্যমুখে ভাসিয়া চলা বালিকার কাছে বিভীষিকাজনক বলিয়া বোধ হইতে লাগিল

একদিন সন্ধ্যার সময় দুইজনে ঢাকা-বারান্দায় বিছানা করিয়া বসিয়াছেসম্মুখে খোলা ছাদবৃষ্টির পরে কলিকাতার দিগন্তব্যাপী সৌধশিখরশ্রেণী জ্যোস্নায় প্লাবিতবাগান হইতে রাশীকৃত ভিজা বকুল সংগ্রহ করিয়া আশা নতশিরে মালা গাঁথিতেছেমহেন্দ্র তাহা লইয়া টানাটানি করিয়া, বাধা ঘটাইয়া, প্রতিকূল সমালোচনা করিয়া, অনর্থক একটা কলহ সৃষ্টি করিবার উদ্‌‍যোগ করিতেছিলআশা এই-সকল অকারণ উপীড়ন লইয়া তাহাকে ভর্সনা করিবার উপক্রম করিবামাত্র মহেন্দ্র কোনো-একটি কৃত্রিম উপায়ে আশার মুখ বন্ধ করিয়া শাসনবাক্য অঙ্কুরেই বিনাশ করিতেছিল

এমন সময় প্রতিবেশীর বাড়ির পিঞ্জরের মধ্য হইতে পোষা কোকিল কুহু কুহু করিয়া ডাকিয়া উঠিলতখনই মহেন্দ্র এবং আশা তাহাদের মাথার উপরে দোদুল্যমান খাঁচার দিকে দৃষ্টিপাত করিলতাহাদের কোকিল প্রতিবেশী কোকিলের কুহুধ্বনি কখনো নীরবে সহ্য করে নাই, আজ সে জবাব দেয় না কেন?

আশা উকণ্ঠিত হইয়া কহিল, “পাখির আজ কী হইল

মহেন্দ্র কহিল, “তোমার কণ্ঠ শুনিয়া লজ্জাবোধ করিতেছে

আশা সানুনয়স্বরে কহিল, “না, ঠাট্টা নয়, দেখো-না উহার কী হইয়াছে

মহেন্দ্র তখন খাঁচা পাড়িয়া নামাইলখাঁচার আবরণ খুলিয়া দেখিল, পাখি মরিয়া গেছেঅন্নপূর্ণার যাওয়ার পর বেহারা ছুটি লইয়া গিয়াছিল, পাখিকে কেহ দেখে নাই

দেখিতে দেখিতে আশার মুখ ম্নান হইয়া গেলতাহার আঙুল চলিল নাফুল পড়িয়া রহিলমহেন্দ্রের মনে আঘাত লাগিলে, অকালে রসভঙ্গের আশঙ্কায় ব্যাপারটা সে হাসিয়া উড়াইবার চেষ্টা করিলকহিল, “ভালোই হইয়াছে, আমি ডাক্তারি করিতে যাইতাম, আর ওটা কুহুস্বরে তোমাকে জ্বালাইয়া মারিতএই বলিয়া মহেন্দ্র আশাকে বাহুপাশে বেষ্টন করিয়া কাছে টানিয়া লইবার চেষ্টা করিল

আশা আস্তে আস্তে আপনাকে ছাড়াইয়া লইয়া আঁচল শূন্য করিয়া বকুলগুলা ফেলিয়া দিলকহিল, “আর কেনছি ছিতুমি শীঘ্র যাও, মাকে ফিরাইয়া আনো গে 

0 মন্তব্য(গুলি):

Post a Comment

Thnaks