Wednesday, October 3, 2012


 RE: উপন্যাসঃ চোখের বালি।। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )
১৫
বাহির হইতে নাড়া পাইলে ছাই-চাপা আগুন আবার জ্বলিয়া উঠেনবদম্পতির প্রেমের উসাহ যেটুকু ম্লান হইতেছিল, তৃতীয়পক্ষের ঘা খাইয়া সেটুকু আবার জাগিয়া উঠিল

আশার হাস্যালাপ করিবার শক্তি ছিল না, কিন্তু বিনোদিনী তাহা অজস্র জোগাইতে পারিত; এইজন্য বিনোদিনীর অন্তরালে আশা ভারি একটা আশ্রয় পাইলমহেন্দ্রকে সর্বদাই আমোদের উত্তেজনায় রাখিতে তাহাকে আর অসাধ্যসাধন করিতে হইত না

বিবাহের অল্পকালের মধ্যেই মহেন্দ্র এবং আশা পরস্পরের কাছে নিজেকে নিঃশেষ করিবার উপক্রম করিয়াছিলপ্রেমের সংগীত একেবারেই তারস্বরের নিখাদ হইতেই শুরু হইয়াছিলসুদ ভাঙিয়া না খাইয়া তাহারা একেবারে মূলধন উজাড় করিবার চেষ্টায় ছিলএই খেপামির বন্যাকে তাহারা প্রাত্যহিক সংসারের সহজ স্রোতে কেমন করিয়া পরিণত করিবেনেশার পরেই মাঝখানে যে অবসাদ আসে, সেটা দূর করিতে মানুষ আবার যে-নেশা চায় সে-নেশা আশা কোথা হইতে জোগাইবেএমন সময় বিনোদিনী নবীন রঙিন পাত্র ভরিয়া আশার হাতে আনিয়া দিলআশা স্বামীকে প্রফুল্ল দেখিয়া আরাম পাইল

এখন আর তাহার নিজের চেষ্টা রহিল নামহেন্দ্র-বিনোদিনী যখন উপহাস-পরিহাস করিত, তখন সে কেবল প্রাণ খুলিয়া হাসিতে যোগ দিততাসখেলায় মহেন্দ্র যখন আশাকে অন্যায় ফাঁকি দিত তখন সে বিনোদিনীকে বিচারক মানিয়া সকরুণ অভিযোগের অবতারণা করিতমহেন্দ্র তাহাকে ঠাট্টা করিলে বা কোনো অসংগত কথা বলিলে সে প্রত্যাশা করিত, বিনোদিনী তাহার হইয়া উপযুক্ত জবাব দিয়া দিবে

এইরূপে তিনজনের সভা জমিয়া উঠিল

কিন্তু তাই বলিয়া বিনোদিনীর কাজে শৈথিল্য ছিল নারাঁধাবাড়া, ঘরকন্না দেখা, রাজলক্ষ্মীর সেবা করা, সমস্ত সে নিঃশেষপূর্বক সমাধা করিয়া তবে আমোদে যোগ দিতমহেন্দ্র অস্থির হইয়া বলিত, “চাকর দাসীগুলাকে না কাজ করিতে দিয়া তুমি মাটি করিবে দেখিতেছিবিনোদিনী বলিত, “নিজে কাজ না করিয়া মাটি হওয়ার চেয়ে সে ভালোযাও, তুমি কালেজে যাও

মহেন্দ্রআজ বাদলার দিনটাতে

বিনোদিনীনা সে হইবে নাতোমার গাড়ি তৈরি হইয়া আছেকালেজে যাইতে হইবে

মহেন্দ্রআমি তো গাড়ি বারণ করিয়া দিয়াছিলাম

বিনোদিনীআমি বলিয়া দিয়াছিবলিয়া মহেন্দ্রের কালেজে যাইবার কাপড় আনিয়া সম্মুখে উপস্থিত করিল

মহেন্দ্রতোমার রাজপুতের ঘরে জন্মানো উচিত ছিল, যুদ্ধকালে আত্মীয়কে বর্ম পরাইয়া দিতে

আমোদের প্রলোভনে ছুটি লওয়া, পড়া ফাঁকি দেওয়া, বিনোদিনী কোনোমতেই প্রশ্রয় দিত নাতাহার কঠিন শাসনে দিনে দুপুরে অনিয়ত আমোদ একেবারে উঠিয়া গেল, এবং এইরূপে সায়াহ্নের অবকাশ মহেন্দ্রের কাছে অত্যন্ত রমণীয় লোভনীয় হইয়া উঠিলতাহার দিনটা নিজের অবসানের জন্য যেন প্রতীক্ষা করিয়া থাকিত

পূর্বে মাঝে মাঝে ঠিক সময়মত আহার প্রস্তুত হইত না এবং সেই ছুতা করিয়া মহেন্দ্র আনন্দে কালেজ কামাই করিতএখন বিনোদিনী স্বয়ং বন্দোবস্ত করিয়া মহেন্দ্রের কালেজের খাওয়া সকাল-সকাল ঠিক করিয়া দেয় এবং খাওয়া হইলেই মহেন্দ্র খবর পায়গাড়ি তৈয়ারপূর্বে কাপড়গুলি প্রতিদিন এমন ভাঁজ-করা পরিপাটি অবস্থায় পাওয়া দূরে থাক্‌, ধোপার বাড়ি গেছে কি আলমারির কোনো-একটা অনির্দেশ্য স্থানে আগোচরে পড়িয়া আছে, তাহা দীর্ঘকাল সন্ধান ব্যতীত জানা যাইত না

প্রথম-প্রথম বিনোদিনী এই-সকল বিশৃঙ্খলা লইয়া মহেন্দ্রের সম্মুখে আশাকে সহাস্য ভর্সনা করিতমহেন্দ্রও আশার নিরুপায় নৈপুণ্যহীনতায় সস্নেহে হাসিতঅবশেষে সখীবাসল্যবশে আশার হাত হইতে তাহার কর্তব্যভার বিনোদিনী নিজের হাতে কাড়িয়া লইলঘরের শ্রী ফিরিয়া গেল

চাপকানের বোতাম ছিঁড়িয়া গেছে, আশা আশু তাহার কোনো উপায় করিতে পারিতেছে নাবিনোদিনী দ্রুত আসিয়া হতবুদ্ধি আশার হাত হইতে চাপকান কাড়িয়া লইয়া চটপট সেলাই করিয়া দেয়একদিন মহেন্দ্রের প্রস্তুত অন্নে বিড়ালে মুখ দিলআশা ভাবিয়া অস্থির; বিনোদিনী তখনই রান্নাঘরে গিয়া কোথা হইতে কী সংগ্রহ করিয়া গুছাইয়া কাজ চালাইয়া দিল; আশা আশ্চর্য হইয়া গেল

মহেন্দ্র এইরূপে আহারে ও আচ্ছাদনে, কর্মে ও বিশ্রামে, সর্বত্রই নানা আকারে বিনোদিনীর সেবাহস্ত অনুভব করিতে লাগিলবিনোদিনীর রচিত পশমের জুতা তাহার পায়ে এবং বিনোদিনীর বোনা পশমের গলাবন্ধ তাহার কণ্ঠদেশে একটা যেন কোমল মানসিক সংস্পর্শের মতো বেষ্টন করিলআশা আজকাল সখীহস্তের প্রসাধনে পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন হইয়া সুন্দরবেশে সুগন্ধ মাখিয়া মহেন্দ্রের নিকট উপস্থিত হয়, তাহার মধ্যে যেন কতকটা আশার নিজের, কতকটা আর-একজনেরতাহার সাজসজ্জা-সৌন্দর্যে আনন্দে সে যেন গঙ্গাযমুনার মতো তাহার সখীর সঙ্গে মিলিয়া গেছে

বিহারীর আজকাল পূর্বের মতো আদর নাইতাহার ডাক পড়ে নাবিহারী মহেন্দ্রকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিল, কাল রবিবার আছে, দুপুরবেলা আসিয়া সে মহেন্দ্রের মার রান্না খাইবেমহেন্দ্র দেখিল রবিবারটা নিতান্ত মাটি হয়, তাড়াতাড়ি লিখিয়া পাঠাইল, রবিবারে বিশেষ কাজে তাহাকে বাহিরে যাইতে হইবে

তবু বিহারী আহারান্তে একবার মহেন্দ্রের বাড়ির খোঁজ লইতে আসিলবেহারার কাছে শুনিল, মহেন্দ্র বাড়ি হইতে বাহিরে যায় নাইমহিনদাবলিয়া সিঁড়ি হইতে হাঁকিয়া বিহারী মহেন্দ্রের ঘরে গেলমহেন্দ্র অপ্রস্তুত হইয়া কহিল, “ভারি মাথা ধরিয়াছেবলিয়া তাকিয়ায় ঠেস দিয়া পড়িলআশা সে কথা শুনিয়া এবং মহেন্দ্রের মুখের ভাব দেখিয়া শশব্যস্ত হইয়া উঠিলকী করা কর্তব্য, স্থির করিবার জন্য বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিলবিনোদিনী বেশ জানিত ব্যাপারটা গুরুতর নহে, তবু অত্যন্ত উদ্‌‍বিগ্নভাবে কহিল, “অনেকক্ষণ বসিয়া আছ, একটুখানি শোওআমি ওডিকলোন আনিয়া দিই

মহেন্দ্র বলিল, “থাক্‌, দরকার নাই

বিনোদিনী শুনিল না, দ্রুতপদে ওডিকলোন বরফজলে মিশাইয়া উপস্থিত করিলআশার হাতে ভিজা রুমাল দিয়া কহিল, “মহেন্দ্রবাবুর মাথায় বাঁধিয়া দাও

মহেন্দ্র বার বার বলিতে লাগিল, “থাক্‌-নাবিহারী অবরুদ্ধহাস্যে নীরবে অভিনয় দেখিতে লাগিলমহেন্দ্র সগর্বে ভাবিল,

বিহারীটা দেখুক, আমার কত আদর

আশা বিহারীর সম্মুখে লজ্জাকম্পিত হস্তে ভালো করিয়া বাঁধিতে পারিল নাফোঁটাখানেক ওডিকলোন গড়াইয়া মহেন্দ্রের চোখে পড়িলবিনোদিনী আশার হাত হইতে রুমাল লইয়া সুনিপুণ করিয়া বাঁধিল এবং আর-একটি বস্ত্রখণ্ডে ওডিকলোন ভিজাইয়া অল্প অল্প করিয়া নিংড়াইয়া দিলআশা মাথায় ঘোমটা টানিয়া পাখা করিতে লাগিল

বিনোদিনী স্নিগ্ধস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “মহেন্দ্রবাবু, আরাম পাচ্ছেন কি

এইরূপে কণ্ঠস্বরে মধু ঢালিয়া দিয়া বিনোদিনী দ্রুতকটাক্ষে একবার বিহারীর মুখের দিকে চাহিয়া লইলদেখিল, বিহারীর চক্ষু কৌতুকে হাসিতেছেসমস্ত ব্যাপারটা তাহার কাছে প্রহসনবিনোদিনী বুঝিয়া লইল, এ লোকটিকে ভোলানো সহজ ব্যাপার নহেকিছুই ইহার নজর এড়ায় না

বিহারী হাসিয়া কহিল, “বিনোদ-বৌঠান, এমনতরো শুশ্রুষা পাইলে রোগ সারিবে না, বাড়িয়া যাইবে

বিনোদিনীতা কেমন করিয়া জানিব, আমরা মূর্খ মেয়েমানুষআপনাদের ডাক্তারিশাস্ত্রে বুঝি এইমতো লেখা আছে

বিহারীআছেই তোসেবা দেখিয়া আমারও কপাল ধরিয়া উঠিতেছেকিন্তু পোড়াকপালকে বিনা-চিকিসাতেই চটপট সারিয়া উঠিতে হয়মহিনদার কপালের জোর বেশি

বিনোদিনী ভিজা বস্ত্রখণ্ড রাখিয়া দিয়া কহিল, “কাজ নাই, বন্ধুর চিকিসা বন্ধুতেই করুন

বিহারী সমস্ত ব্যাপার দেখিয়া ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিলএ কয়দিন সে অধ্যয়নে ব্যস্ত ছিল, ইতিমধ্যে মহেন্দ্র বিনোদিনী ও আশায় মিলিয়া আপনা-আপনি যে এতখানি তাল পাকাইয়া তুলিয়াছে তাহা সে জানিত নাআজ সে বিনোদিনীকে বিশেষ করিয়া দেখিল, বিনোদিনীও তাহাকে দেখিয়া লইল

বিহারী কিছু তীক্ষ্ণস্বরে কহিল, “ঠিক কথাবন্ধুর চিকিসা বন্ধুই করিবেআমিই মাথাধরা আনিয়াছিলাম, আমি তাহা সঙ্গে লইয়া চলিলামওডিকলোন আর বাজে খরচ করিবেন নাআশার দিকে চাহিয়া কহিল, “বৌঠান, চিকিসা করিয়া রোগ সারানোর চেয়ে রোগ না হইতে দেওয়াই ভালো 

0 মন্তব্য(গুলি):

Post a Comment

Thnaks